Tuesday, July 5সময়ের নির্ভীক কন্ঠ
Shadow

করোনার লোকসান ঈদে পোষানোর টার্গেট

নিজস্ব প্রতিবেদক: প্রতিবছর ঈদ এলে রাজধানীর মার্কেটগুলো জমে ওঠে। গত দুই বছর করোনা মহামারির প্রভাব পড়ে পুরো বিশ্বে। এখন অনেকটা কেটে উঠেছে অতিমারি করোনা। ব্যবসায়ীরা সারা বছর ঈদের অপেক্ষায় থাকেন। তবে দুই বছরের লোকসান পোষানোর টার্গেট থাকলেও আশানুরূপ ক্রেতা পাচ্ছেন না পোশাক ব্যবসায়ীরা। ইতোমধ্যে হরেক রকমের পোশাকের সংগ্রহ বাড়িয়েছেন তারা।

তবে আশা করা হচ্ছে, শিগগিরই জমে উঠবে ঈদবাজার। ইতোমধ্যে সরকারি চাকরিজীবী, ব্যাংক কর্মকর্তা এবং কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানে কর্মরতদের বেতন হয়ে গেছে। তারা ধীরে ধীরে বাজারমুখী হচ্ছেন। সব সীমাবদ্ধতার মাঝেও বাজার জমবে এমনটাই প্রত্যাশা বিক্রেতাদের। ক্রেতা কম থাকার পরও সম্ভাবনা দেখছেন নিউমার্কেট ব্যবসায়ী নেতারা।

তারা জানান, ঈদুল ফিতরে এবার খুচরা বাজারে ১০-১২ হাজার কোটি টাকার বেচাকেনা হবে। দেশি-বিদেশি পোশাকের জন্য সুপরিচিত রাজধানীর নিউমার্কেট, চন্দ্রিমা, গাউছিয়া, আজিজ সুপার, রাজধানী ও মৌচাক মার্কেটের দোকানগুলো। প্রতিদিন সকাল ৯টা থেকে ক্রেতাদের জন্য উন্মুক্ত করা হয় মার্কেট। সারা বছর রাজধানীর মার্কেটগুলো সাধারণত রাত ১০টায় বন্ধ হলেও রমজানে ১১ থেকে ১২টায় মার্কেট বন্ধ হচ্ছে। রমজানের শেষের দিকে ঈদ যখন দরজার কাছে চলে আসে তখন সারা রাতও মার্কেট খোলা রাখতে দেখা যায়।

অন্যান্য বছর ব্যবসায়ী ও ক্রেতাদের মাঝে রোজার শুরু থেকেই ঈদের আমেজ থাকলেও এবারের চিত্র ভিন্ন। তবে আশার কথা হচ্ছে, রোজার সংখ্যা বাড়ার সাথে সাথে ক্রেতাদের উপস্থিতিও বাড়ছে। ব্যবসায়ীদের এবার ঈদবাজারে বড় টার্গেট থাকলেও তা নির্ভর করছে সাধারণ মানুষের ক্রয় ক্ষমতার ওপর।

নিত্যপ্রয়োজনীয় প্রায় সব ধরনের দ্রব্যের দাম বাড়ায় সাধারণ ও নিম্নবিত্তদের দৈনন্দিনের ব্যয় বহন করা কষ্টকর। ঈদ আনন্দের বিষয় হলেও নিম্নবিত্তের কাছে তা দুশ্চিন্তার কারণ। গুনতে হয় বাড়তি খরচ। মাসের প্রথম সপ্তাহে সরকারি-বেসরকারি কর্মকর্তাসহ ব্যাংক-কর্পোরেট কর্মকর্তা থেকে শুরু করে সব চাকরিজীবী ইতোমধ্যেই বেতন পেয়েছে। এদের একাংশ ঈদের কেনাকাটা শুরু করে দিয়েছে। তবে অধিকাংশই এখনো ঈদবাজার করার কথা ভাবেনি।

বেসরকারি চাকরিজীবী বেলাল হোসেন বলেন, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির ফলে সংসার চালানো এখন দায়। ঈদ বোনাসের ওপর নির্ভর করবে আমাদের ঈদের কেনাকাটা। নিউমার্কেটের ব্যবসায়ী নাসির হোসেন জানান, এবারের ঈদবাজারে এখনো ভালো কিছু দেখা যাচ্ছে না। আমরা এবার আশা নিয়ে তুলনামূলক বড় বাজেট নিয়ে ঈদবাজার শুরু করেছি। কিন্তু আশানুরূপ কিছু এখনো দৃশ্যমান হয়নি।

অন্য এক ব্যবসায়ী জানান, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির প্রভাবে মানুষ মৌলিক খরচ মেটাতে হিমশিম খাচ্ছে। এজন্য এখনো মানুষ ঈদ কেনাকাটার চিন্তা করেনি। তবে আশা করা যায়, ১০ রোজার পর ক্রেতার সংখ্যা বাড়বে।

নিউমার্কেটের ব্যবসায়ী মিজান বলেন, মার্কেটের সামনের ফুটওভার ব্রিজ ঝুঁকিপূর্ণ হওয়ায় রমজানের আগে থেকেই বন্ধ রয়েছে। যার ফলে রাস্তার ওপারের মানুষ এপারে খুব কমই আসে। কেনাবেচা কম হওয়ায় পেছনে এটি একটি কারণ বলে জানান তিনি। রাজধানীর অধিকাংশ দোকানেই শোভা পাচ্ছে দেশি কারখানায় তৈরি পাঞ্জাবি, থ্রি পিস, বাচ্চাদের পোশাকের পাশাপাশি ভারতীয় হরেক রকম পোশাক। ঈদ সামনে রেখে বেচাকেনা এখনো জমে উঠেনি জানিয়ে মানিক বলেন, বেচাকেনা এখনো পুরোদমে শুরু হয়নি।

পাঞ্জাবির বিপুল সমাহার পীর ইয়েমেনী মার্কেটের তাজ পাঞ্জাবি বিতানের স্বত্বাধিকারী নাজমা আক্তার জানান, গত দুই বছর করোনার কারণে আমাদের লোকসান গুনতে হয়েছে। এবার দেশি কালেকশনের পাশাপাশি অনেক বিদেশি কালেকশন এসেছে।

তিনি আরও বলেন, সব কিছুর দাম বাড়ার ফলে মানুষ এখন অগ্রাধিকারভিত্তিক কেনাকাটা করেন। তারপরও শেষ পর্যন্ত ভালো কিছুর অপেক্ষায় থাকবেন বলে জানান তিনি। দফায় দফায় তেল, গ্যাসসহ যাবতীয় দ্রব্যমূল্য বাড়ায় জনজীবন স্থবির হয়ে পড়েছে। মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়লেও সে হিসেবে বাড়েনি আয়। নিম্ন আয়ের মানুষের কাছে ঈদ যেন বাড়তি চাপ। সব কিছুর দাম বাড়ায় এবার পরিবারের সবার ঈদ পোশাক কেনার সক্ষমতা রাখেন না অনেকেই।

ডাক পিয়ন হামিদ মিয়া জানান, এবার দুই মেয়েকে ঈদের পোশাক দিতে পারলেও বড় ছেলেকে হয়তো দিতে পারব না। স্বল্প আয়ে এখন সংসার পরিচালনা করা দিন দিন কঠিন হয়ে যাচ্ছে।

পুতুল ফ্যাশনের মালিক বলেন, অন্যান্য বছর যারা তিন-চারটি জামা কিনত তারা এবার একটায় নেমে এসেছে। এছাড়া এবার ক্রেতা এমনিতেই কম। এখন ব্যবসায় টিকে থাকাই কঠিন হয়ে পড়েছে। এখন যারা কেনাকাটা করতে এসেছে, তাদের অধিকাংশই ঈদ উপলক্ষে নয়, সাধারণ কেনাকাটার জন্য আসছেন ক্রেতারা। তবে কেউ কেউ অবসর সময়ে মার্কেটে ঘুরছেন, নতুন কালেকশন দেখার জন্য। তেমনি একজন কান্তা লতা।

লালমাটিয়া এলাকা থেকে এসেছেন তিনি। মার্কেট ঘুরে ঘুরে দেখছেন নতুন কী ধরনের পোশাক এসেছে। পুরান ঢাকার শামীমা তার চার বছরের ছেলেকে নিয়ে ঈদের পোশাক কিনতে আসেন নিউমার্কেটে। তিনি তার ছেলের জন্য প্যান্ট আর জুতা নিয়েছেন। তিনি জানান, এবার আর্থিক অবস্থা ভালো না থাকায় চাহিদা মতো সব কেনা যাচ্ছে না।

এবারের ঈদে থাকছে নানা ব্রান্ডের চমৎকার সব কালেকশন। গ্রামীণ ইউনিক্লোর রয়েছে ছেলেদের জন্য বিশেষ ফেব্রিকে তৈরি পাঞ্জাবি কালেকশন, তবে এটি অন্যান্য কাপড়ের চেয়ে হালকা এবং টেকসই। এছাড়া শার্ট, নন আয়রন ইজি কেয়ার শার্ট, পায়জামা, ডেনিম প্যান্টস, কাইতেকি প্যান্টস। মেয়েদের জন্য রয়েছে কারচুপি কাজ করা জর্জেট কামিজ এবং আরামদায়ক ভিসকস কামিজ। বিভিন্ন রঙের এবং প্রিন্টের লং শার্ট, টপস এবং টিউনিকস।

বটমস কালেকশন হিসেবে কামিজের জন্য রয়েছে এমব্রয়ডারি স্ক্যান্টস, পালাজ্জো, লেগিংস। ঈদ কালেকশন সম্পর্কে গ্রামীণ ইউনিক্লোর দোকান ব্যবস্থাপক বলেন, প্রতি ঈদেই আমরা নতুন নতুন কালেকশন নিয়ে আসি। সবরকম ক্রেতাদের চাহিদাকে বিবেচনা করে আমরা ছেলে ও মেয়েদের বিভিন্ন রকম ডিজাইনের ও ফেব্রিকের পোশাক নিয়ে এসেছি। পোশাকের রঙেও থাকছে বৈচিত্র্য। ঈদ আয়োজনে ছেলে শিশুদের শার্ট বা ফতুয়ায় প্রাধান্য পাচ্ছে শর্ট স্লিভ এবং ফুল স্লিভ।

লং প্যান্টের পাশাপাশি রয়েছে কোয়ার্টার প্যান্ট। সাদা পাঞ্জাবির পাশাপাশি ভাইব্রেন্ট কালারেরও পাঞ্জাবি থাকছে। মেয়ে শিশুদের জন্য থাকছে ফ্রক, পার্টি ফ্রক, থ্রি পিস, জাম্প সুট, ফ্যাশন টপ্স, নীমা সেট, টপ বটম সেট। এছাড়াও ছেলে শিশুদের জন্য থাকছে পাঞ্জাবি, কাতুয়া, লং ও শর্ট স্লিভ শার্ট, পলো টি-শার্ট, ফ্যাশনেবল শার্ট-প্যান্ট সেট, বয়েজ কার্গো ইত্যাদি। এছাড়াও থাকছে বাবা-ছেলের পাঞ্জাবি ও কাবলির মিনিমি। সারার এবার ঈদের বিশেষ আয়োজনের মধ্যে থাকছে ফুল ফ্যামিলি একই ডিজাইনের পোশাকের সংগ্রহ।

এক ক্রেতা বলেন, নিউমার্কেট ও সায়েন্স ল্যাব এলাকার পাঞ্জাবিগুলোর দাম হাতের নাগালে রয়েছে। তবে আগের চেয়ে দাম অনেক বেড়েছে। তবে গুলিস্তানে পীর ইয়েমেনি মার্কেটে আরও কম দামে পোশাক পাওয়া যায়। নিউমার্কেট, চন্দ্রিমা, গাউছিয়া, রাজধানী, পীর ইয়েমেনি, ট্রেড সেন্টারে ঘুরে ঈদ বেচাকেনায় এসব চিত্র দেখা গেছে। স্বাভাবিক সময়ের মতো চলছে বেচাকেনা। ঈদের সঙ্গে সম্পর্কিত কেনাকাটা এখনো শুরু করেনি মানুষ। ১০ রমজানের পর ঈদের কেনাবেচা শুরু হতে পারে বলে আশা করছেন ব্যবসায়ীরা। এখনো ঈদের বাজার জমেনি বলে জানিয়েছেন রাজধানীর ব্যবসায়ীরা।

স্বাভাবিক সময়ের মতো চলছে বেচাকেনা। তবে হঠাৎ বাজারে সব ধরনের পোশাকের দাম কিছুটা বেড়েছে। খুচরা বিক্রেতাদের বাড়তি দামে পণ্য কিনতে হচ্ছে। ফলে খুচরা বাজারেও এর প্রভাব পড়বে। এবার বিক্রেতাদের লক্ষ্য সর্বোচ্চ মুনাফা। বিপরীতে ক্রেতারা হিমশিম খাচ্ছে কেনাকাটায়।

শেয়ার বাটন

Leave a Reply

Your email address will not be published.